আত্মপরিচয়ের সঙ্কট ও বাঙালি মুসলিম


আত্মপরিচয়ের সঙ্কট ও বাঙালি মুসলিম
শ্রীশুভ্র

বাংলার একটি সুপ্রাচীন ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাস সম্বন্ধে, অল্পবিস্তর আমরা সকলেই অবহিত। কিন্তু আবহমান কালের ধারাবাহিকতায় আমরা অনেকেই ভুলে যাই যে, আমাদের ইতিহাসের প্রধান বৈশিষ্টই হলো বৈদেশিক জাতির কাছে ক্রমান্বয়ে বশ্যতা স্বীকার করা। আর ক্ষমতাধর শাসকের বশ্যতা স্বীকারের এই ঐতিহ্যই বাঙালির মূল ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার। সময়ের স্রোতে যে কালে যে বৈদেশীক ক্ষমতা বাংলা ও বাঙালির উপর প্রভুত্ত স্থাপন করেছে, বাঙালি তখন তারই বশ্যতা স্বীকার করে নিয়ে প্রশাসকের ভাষা ও সংস্কৃতিকে আপন করে নেওয়ার প্রয়াস করেছে। ভালোবেসে ফেলেছে। এবং ক্রমে তাকে আত্মস্থ করে নিয়ে আত্মপ্রসাদ লাভ করেছে। অনেকেই বলবেন একথা সম্পূর্ণ সত্য নয়, তাঁরা বারো ভুঁইয়ার ইতিহাসের উল্লেখ করবেন। তাঁরা তুলে ধরবেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। বলবেন আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের কথা। বলবেন না, পাশাপাশি ভারতস্থিত পশ্চিমবাংলার কথা। বলবেন না আরও আনেক কিছুই। কিন্তু একথা ঐতিহাসিক ভাবেই সত্য যে, বাংলা ও বাঙালির মূল ইতিহাস বশ্যতা স্বীকারের ইতিহাস। এইখানে আমি প্রখ্যাত গবেষক ও প্রাবন্ধিক ডঃ আহমদ শরীফের ‘বাঙালির ইতিহাস সন্ধানে’ প্রবন্ধের পঞ্চম অনুচ্ছেদ থেকে উদ্ধৃতি না দিয়ে পারছি না। উনি লিখছেন; “…..বহুকাল এই দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মানুষ অভিন্ন জাতিসত্তায় সংহত হতে পারে নি। বরং বিভিন্ন বিদেশীয় আঞ্চলিক শাসনে ক্লিষ্ট, আত্মপ্রত্যয়হীন মানুষ আত্মমর্যাদালাভের বিকৃত বাসনায় মিথ্যা পরিচয়ে আত্মতুষ্টির যে পথ অবলম্বন করেছিল তা পরিণামে আত্মহননের নামান্তর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কেননা, এতে জাতিসত্তার স্বাতন্ত্র্যবোধ প্রায় চিরতরে বিলুপ্ত হয়েছে। ঐ বৈনাশিক সংস্কারের প্রভাব আজো আম্লান। বাঙালীমাত্রেই তাই সত্য পরিচয় স্বেচ্ছায় পরিহার করে আঙ্গীকৃত সরকার ও সংস্কৃতির কেন্দ্রভূমিকে স্বদেশ এবং শাস্ত্রকার ও শাসকের স্বজাতি বলে জেনে আত্মপ্রোবধ পেতে থাকে। তাই এদেশে বৌদ্ধমাত্রেই ছিল মগধী, ব্রাহ্মণ্যবাদীমাত্রেই আর্যাবর্ত ব্রহ্মবর্তের আর্য। মুসলিম মাত্রেই আরব-ইরানি কিংবা মধ্য-এশিয়। ফলে আজো শিক্ষিত অভিজাত বাঙালিমাত্রেই চেতনায় প্রবাসী ও বিদেশীয় জ্ঞাতিত্বগর্বী, তাই ভিন্নমতের প্রতিবেশীমাত্রেই পর”। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, অনেকেই বাঙালির এই ঐতিহাসিকতার প্রামাণ্যতা নিয়েই তর্ক তুলে দেবেন। কিন্তু তাঁদের সেই তর্কে না ঢুকেও বাংলা ও বাঙালির মূল ইতিহাস সন্ধান করলেই ডঃ আহমদ শরীফের প্রতিটি কথারই প্রমাণ পাওয়া যাবে। শরীফের এই বক্তব্য থেকে দুটি প্রধান বিষয় সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি হল, বাঙালি কোন কালেই ‘অভিন্ন জাতিসত্তা’য় সংহত হতে পারে নি। আর তার মস্তবড়ো প্রমাণস্বরূপ স্বগর্বে দাঁড়িয়ে রয়েছে দুই বাংলার মধ্যবর্তী সুদীর্ঘ ও সুদৃঢ় রাজনৈতিক কাঁটাতারের নিশ্ছিদ্র বেড়া। এবং দ্বিতীয় প্রধান বিষয়টি হল বাঙালি চিরকালই ‘মিথ্যা পরিচয়ে’র বলয়েই আত্মতুষ্টি লাভ করতে অভ্যস্থ। আবহমান কালব্যাপি একটি জাতি যদি ক্রমাগত ভাবে বিভিন্ন বৈদেশীক শাসকের  ভাষা ও সংস্কৃতির বশ্যতা স্বীকার করতেই অভ্যস্থ হয়ে যায়, তখন সেই জাতির পক্ষে আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান আর সম্ভব হয় না। বরং স্বকল্পিত মিথ্যাপরিচয়ই তার অস্তিত্বে সত্য হয়ে ওঠে। বাঙালির জাতীয় জীবনে এইটিই অন্যতম প্রধান অভিশাপ। আর এই অভিশাপের পথ দিয়েই বাঙালি ইতিহাসের বিভিন্ন পর্ব ধরে নানান রকমের বৈদেশিক সংস্কৃতির বশ্যতা স্বীকারের মধ্যে দিয়ে একাধিক গোষ্ঠীতেই বিভক্ত হয়ে পড়েছে। সেই কারণেই বাঙালির কোন অভিন্ন জাতিসত্তা গড়ে ওঠেনি। বাংলা ও বাঙালির এটাই মূল ইতিহাস।

সহবাসের অভিমুখ


সহবাসের অভিমুখ
শ্রীশুভ্র

দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক নরনারীর পারস্পরিক সম্মতিতে ঘটা সহবাসের অভিমুখ কোনদিকে? ভালোবাসায় না শুধুমাত্র তাৎক্ষণিক যৌন পরিতৃপ্তিতেই সীমাবদ্ধ? নাকি বৈবাহিক পরিণতির অভিমুখেই। এই বিষয়টি তো সেই দুইজন নরনারীর পারস্পরিক চাহিদা ও পরিকল্পনার উপরেই নির্ভরশীল হওয়ার কথা। সেখানে সমাজের মাথা গোলানোর দরকারই বা কি? এখন মুশকিল হলো নরনারী যখন পারস্পরিক বিশ্বাস ভালোবাসা থেকে বেড়িয়ে এসে তাদের একান্ত সম্পর্ককে জনসমক্ষে নিয়ে এসে পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে দোষারোপ শুরু করে তখনই। জনসাধারণ তাদের কোন একজনকে বিশ্বাস করে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েন। চলতে থাকে বিতর্ক। কিন্তু এই বিতর্কের মধ্যে দিয়েই ফুটে ওঠে আমাদের সমাজের সামগ্রিক একটি চিত্র। সাধারণ ভাবে আমাদের বাঙালি সমাজের রক্ষণশীল ধারায়, বিবাহের আগে সহবাস অনুমোদন যোগ্য বিষয়ই নয়। যেসব পরিবার খুব বেশি গোঁড়া, তা সে বাঙালি হিন্দুই হোক আর মুসলিম, সেইসব পরিবারে প্রাক বিবাহ সহবাসের ব্যাপারে বিধিনিষেধ রীতিমত কড়া ধরণের হয়ে থাকে। কিন্তু যৌবনের ধর্মই হরমোন নিয়ন্ত্রীত। সেই অমোঘ নিয়ন্ত্রণের সুতীব্র টান এড়াতে না পেরে অনেক যুবক যুবতীই প্রাক বৈবাহিক সহবাসে সঙ্গোমসুখে লিপ্ত হতে উদ্গ্রীব হয়ে ওঠে। এ বিশ্বপ্রকৃতির বিধান। কিন্তু মানুষের সমাজ সভ্যতায় এক এক অঞ্চলে এক একটি ধর্মীয় সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত সমাজ ব্যবস্থায় সমাজবদ্ধ মানুষ সেই সমাজের ধর্মীয় কিংবা সমাজিক বিধান মেনে চলতেই অভ্যস্থ থাকে। যৌবনের প্রমত্ত উল্লাসে সেই বিধান কেটে বেড়িয়ে আসা যুবক যুবতীকে নিয়েই সমাজে আলোড়ন ওঠে সবচেয়ে বেশি।

বই বিমুখ বাঙালি


বই বিমুখ বাঙালি
শ্রীশুভ্র

রাস্তা ঝাঁট দিয়ে অর্থ উপার্জন বরং অনেক সহজ। কিন্তু লেখালেখি করে অর্থ উপার্জন আদৌ সহজ নয়। পেশা হিসাবে রাস্তা ঝাঁট দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে ও সংসারধর্ম পালন করে বহু মানুষ বেঁচে আছে। কিন্তু পেশা হিসাবে লেখালেখি করে জীবিকা নির্বাহ করে সংসারধর্ম পালন করতে খুব কম মানুষকেই দেখা যায়। তাও জীবনের অনেক বছরের সংগ্রামের পর, জনপ্রিয়তার নিরিখে একমাত্র কোন কোন লেখক সাহিত্যিকের পক্ষেই পেশা হিসাবে লেখালেখিকে আঁকড়ে ধরা সম্ভব হয়। তাদের সংখ্যা গুটি কয়েক। কিন্তু বাকি যাঁরা আজীবন লেখালেখির সাধনায় ব্যস্ত পেশা হিসাবে তাঁদেরকে অন্য কোন না কোন কাজকেই বেছে নিতে হয়। আর নয়তো স্বামী বা স্ত্রীর আয়ের উপর নির্ভর করে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয় লেখালেখির একান্ত সাধনাকে। না রাস্তা ঝাঁট দেওয়ার পেশার প্রতি কোনরকম কটাক্ষ করা আমাদের উদ্দেশ্য নয় আদৌ। বা পেশা হিসাবে ঝাড়ুদারীর সাথে লেখালেখির কোন তুলনা টানাও নয়। বলার কথা শুধু এইটুকুই যে একজন ঝাড়ুদারের পক্ষেও সংসার চালানো সম্ভব হয়। কিন্তু একজন লেখককের পক্ষে সেই একই কাজ দুঃসাধ্য। কিন্তু কেন? প্রশ্নটি সেখানেই।

দেখা হয় নি স্বদেশ

দেখা হয় নি স্বদেশ
শ্রীশুভ্র


দেশ আর দ্বেষের মধ্যে কি কোন আত্মিক সম্পর্ক আছে? তা কি করে হয়? সে কথাই কিন্তু মনে হবে প্রথমে। সকলেরই মনে। মানুষ মাত্রেই কোনো না কোনো দেশের নাগরিক, বাসিন্দা। যে দেশকে সে মন থেকে ভালোবাসে আপ্রাণ। যাকে আমরা দেশপ্রেম বলে অভিষিক্ত করে থাকি গাল ভরা বিশেষণে। সেই যে দেশপ্রেমের দেশ, কোথায় তার সাথে দ্বেষের সম্পর্ক? মানুষ মাত্রেই কোন না কোন দেশের নাগরিক হলেও মানুষ মাত্রেই কিন্তু কোন না কোন দ্বেষ লালন করেন না সব সময়ে। সবখানে। সকলে। তাহলে? হঠাৎ দেশের সাথে দ্বেষের একটা যোগাযোগ ঘটিয়ে দেওয়ার প্রয়াস কেন? দেশ আর দ্বেষের মধ্যে সমন্বয় সাধনের অপপ্রয়াস না কি? না কি দুইটি বিষয়ের মধ্যে তুলনামূলক সমাপতন টেনে ভালোমন্দের বিচার সভার আয়োজন? সে কথা সম্পাদকই ভালো বলতে পারবেন একমাত্র। আপাতত, সাধারণ ভাবে প্রতিদিনের ঘুম ভাঙ্গা চোখ কচলে কি দেখতে পাই আমরা? সকালের প্রভাতী সংবাদের পাতা থেকে ঘড়ির সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলা সময়ের সাথে তাল রাখতে গিয়ে হিমশিম খেতে থাকা রোজকার ইঁদুর দৌড়ে? আসুন বরং চোখ রাখি সেই রেখাচিত্রেই।

রবিঠাকুরের চোখে জল

রবিঠাকুরের চোখে জল

শ্রীশুভ্র

যদি মানুষের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা থাকে তবে লোকের ঘরে আগুন লাগানো এবং মারধর করিয়া গুণ্ডামি করিতে আমাদের কদাচই প্রবৃত্তি হইবে না: তবে আমরা পরম ধৈর্যের সহিত মানুষের বুদ্ধিকে হৃদয়কে, মানুষের ইচ্ছেকে, মঙ্গলের দিকে, ধর্মের দিকে আকর্ষণ করিতে প্রাণপাত করিতে পারিব। তখন আমরা মানুষকেই চাহিব, মানুষ কী কাপড় পরিবে বা কী নুন খাইবে তাহাই সকলের চেয়ে বড়ো করিয়া চাহিব না। মানুষকে চাহিলে মানুষের সেবা করিতে হয়, পরস্পরের ব্যবধান দূর করিতে হয়’ নিজেকে নম্র করিতে হয়। মানুষকে যদি চাই তবে যথার্থভাবে মানুষের সাধনা করিতে হইবে; তাহাকে কোনমতে আমার মতে ভিড়াইবার, আমার দলে টানিবার জন্য টানাটানি মারামারি না করিয়া আমাকে তাহার কাছে আত্মসমর্পণ করিতে হইবে” [-সদুপায়]

বহুগামিতা ও পুরুষতন্ত্র

বহুগামিতা ও পুরুষতন্ত্র
শ্রীশুভ্র
আমাদের ধনতান্ত্রিক ভোগবাদী দুনিয়ার প্রেক্ষিতে আমরা ক্রমেই পেতেই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি! তাই প্রাপ্তির কোটা পুরোপুরি পুরণ না হলেই মনের মধ্যে জমে ওঠা ক্ষোভের বিক্ষুব্ধ বাষ্প অসহিষ্ণু করে তোলে আমাদের! সেই অসহিষ্ণুতার অস্থিরতায় খেয়ালই থাকে না যে, আমার দেওয়ার কোটায় আর একজনের অপ্রাপ্তির ব্যাথা বেদনা রয়ে গেল কিনা! ফলে পারস্পরিক এই অসহিষ্ণুতার মল্লযুদ্ধে দাম্পত্যের ফাটল ক্রমেই প্রশস্ত হতে থাকে! তবু সমাজ সংসারের ঘেরাটোপে ভাঙ্গা সম্পর্ক নিয়েই নরনারী তাদের জীবন ধারণ করে চলে! মনের গহন গভীর অন্তরে তবু রয়ে যায় প্রেম! তবু এক হৃদয়ের প্রীতির আকাঙ্খা চেতন অবচেতনের দ্বন্দ্ববিধুর সংবর্তে স্বপ্ন বোনে মনের অজান্তে!

এক সাধারণ রবিঠাকুরের গল্প


এক সাধারণ রবিঠাকুরের গল্প
শ্রীশুভ্র

“মনুষ্যত্বের অন্তহীন প্রতিকারহীন পরাভবকে চরম বলে বিশ্বাস করাকে আমি অপরাধ বলে মনে করি”।  খুব গভীর জীবনবোধ ও ইতিহাস জ্ঞান থেকেই এই বিশ্বাসটুকু অর্জন করেছিলেন কবি। কিন্তু জীবনের একেবারে প্রান্ত সীমায় এসে এক দ্বান্দ্বিক সংকটে পড়লেন বিশ্ববরেণ্য কবি রবীন্দ্রনাথ। যে সংকট থেকে জন্ম নিল তাঁর বহু পঠিত রচনা ‘সভ্যতার সংকট’। শেষ বেলাকার রবিকে যখন বার বার নিজেকে প্রবোধ দিতে হচ্ছে এই বলে যে, “সত্য বড়ো কঠিন, সেই কঠিনেরে ভালোবাসিলাম”। কিন্তু সত্যই কি যা কঠিন, যা নিদারুণ, যা ভয়ানক তা যতই সত্য হোক তাকে ভালোবাসা যায়? না কি আমরা শুধু তাকেই ভালোবাসতে পারি, যা মনোরম, যা সুন্দর, যা মানবিক। আর এক কবি তো এক সময় বিশ্ববীণার ললিত ছন্দকে বেঁধেই দিয়ে গিয়েছিলেন এই বলে যে, “সত্যই সুন্দর। সুন্দরই সত্য’। যে ছন্দের নির্যাসে অবগাহন করেই আত্মপ্রকাশ যুবক রবীন্দ্রনাথের কাব্যভুবনের। শুধু তো যুবক রবীন্দ্রনাথের কাব্যভুবনের দিগন্তই নয়, সেই সুরেই বাঁধা পড়েছিল সমগ্র রবীন্দ্রনাথের বিশ্বাসের ভুবনটুকুও অনুভবের অতলান্ত পরিসরে। কি সাংঘাতিক কাণ্ড! কিন্তু প্রান্ত বেলায়, দিবসের শেষ সূর্য যখন প্রশ্ন করছে শেষ বেলাকার রবিকে ‘কে তুমি’ যে প্রশ্নের উত্তরে নিরব রয়ে যায় জগৎ চরাচর। সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতো আসা নিস্তবদ্ধ সন্ধ্যায় জীবনের সব লেনদেন ফুরানোর লগ্নে যখন থাকে শুধু অন্ধকার মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন, তখন কি সত্যই শান্তি খুঁজে পেয়েছিলেন অশীতিপর চিরনবীন কবি রবীন্দ্রনাথ? না কি নিজের মধ্যেই ভুগছিলেন এক অপরাধ বোধে, মনুষ্যত্বের অপরাজেয় শক্তির উপর টলে যাওয়া বিশ্বাসের ট্রাপিজ দড়িঁতে দাঁড়িয়ে? নয়তো কেন বলতে হবে তাকে, মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ? তবে কি সত্যই সেই বিশ্বাটুকু নিজেই হারিয়ে ফেলেছিলেন বেদান্তদর্শনের ঔরসজাত আমাদের প্রিয় কবি? তাই কি তাকে বলতে হচ্ছিল সত্য বড়ো কঠিন? সেই কঠিনেরে (প্রাণপন প্রয়াসে রক্তের শেষবিন্দু দিয়ে দেউলিয়া বিশ্বাসের শেষ তলানিটুকু দিয়েও) ভালোবাসতে হচ্ছিল ক্রান্তদর্শী কবিকে?

আত্মহত্যার আগে



আত্মহত্যার আগে
শ্রীশুভ্র

মহাপৃথিবীর এই জীবনে চলার পথে সংসার জীবনের ঘাত প্রতিঘাতে অনেকেই আমরা অনেক সময় রণক্লান্ত হয়ে ভাবি, থাক আর দরকার নাই বেঁচে থাকার। রোজকার দৈন্দিন জীবনের একঘেয়ে আবর্তনে আবদ্ধ মন কখনো সখনো বিদ্রোহও করে ওঠে। বেঁচে থাকার কষ্টকর গ্লানি থেকে পরিত্রাণ পেতে মৃত্যুই একমাত্র সমাধান বলে মনে হয়। কখনো প্রিয়জনের উপর অভিমান বশতঃ ক্ষুব্ধ মনের বাষ্পাকুল আবেগ আমাদের মনে আত্মহননের ইচ্ছাও জাগিয়ে তোলে। কিন্তু তাই বলেই আমরা যে তৎক্ষনাৎ আত্মহত্যার পথে পা বাড়াই, আদৌ তেমন নয় বিষয়টি সময়ের স্রোতে সেই আবেগও একসময় থিতিয়ে পড়ে জীবনের স্বাভাবিক নিয়মেই। বেঁচে থাকার আনন্দের মধ্যেই আমরা আবার ফিরে পাই যার যার জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ। ছন্দপতনের হাত থেকে রক্ষা করে নিই নিজেকেই। নিজেরই স্বাভাবিক যুক্তি তর্ক বোধের গণ্ডীতে। তবুও খবরের কাগজের পাতায় পাতায় আত্মহননের কতরকম কাহিনীকখনো সখনো আমাদের মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে সেই সব অকাল বিয়োগের বিয়োগান্ত গল্পে। অধিকাংশ সময়ই আমরা প্রাত্য়হিক ব্যস্ততায় সেই সব ঘটনাকে স্বাভাবিক জীবন বাস্তবতা ভেবেই পাশ কাটিয়ে চলে যাই। কিন্তু আমরা কি আদৌ ভেবে দেখি, একজন মানুষের মানসিক অবস্থার সেই মুহূর্ত্তটি ঠিক কেমন হতে পারে, যখন তিনি দৃঢ় পদক্ষেপে পা বাড়িয়ে দিলেন নিশ্চিত মৃত্যুর অভিমুখে? আত্মহননের সেই প্রাক মুহূর্ত্তেও তো তাঁর যুক্তি তর্ক বোধের দিগন্তে কোন না কোন ভাবনা চিন্তা চলতেই থাকে। নিজের পরিকল্পনার স্বপক্ষে তাঁর ধারালো যুক্তিই নিশ্চয় তাঁকে অবিচল চিত্তে এগিয়ে দেয় নিশ্চিৎ মৃত্য়ুর ভয়াবহ পরিণতির দিকেই। কিন্তু এ কেমন যুক্তি তর্ক বোধ, যা নিজের প্রবাহমান জীবনের ছন্দেই পরিপূর্ণ দাঁড়ি বসিয়ে ঘটিয়ে দেয় অমোঘ ছন্দপতন?

সাহিত্যে শ্লীলতা ও অশ্লীলতা

সাহিত্যে শ্লীলতা ও অশ্লীলতা
শ্রীশুভ্র

সাহিত্যে শ্লীলতা ও অশ্লীলতা নিয়ে তর্ক বিতর্কের শেষ নাই। এই তর্ক বহু যুগ ধরেই চলে এসেছে, আরও বহু যুগ চলতেও থাকবে। একসময়ের অশ্লীলতার দোষে দুস্ট সাহিত্য পরবর্তী বহু যুগের সাহিত্য ও সাহিত্যপ্রেমীদের সাহিত্যবোধকে পুষ্ট করেছে, এমন দৃষ্টান্তও ভুরিভুরি। অনেকেই বলেন সাহিত্যের ভাষা হবে লেখকের ব্যক্তিচরিত্র ও রুচির প্রতিফলন। যে ভাষা থেকে পাঠক তার পছন্দের সাহিত্যিকের ব্যক্তিরুচির ও সংস্কৃতির এইকটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি এঁকে নিতে পারবে নিজের ভক্তির দর্পনে। যে ছবিটিই পাঠককে উদ্বুদ্ধ করবে সেই সাহিত্যিককে পুজো করতে। এটি আসলেই ব্যক্তি পুজোরই নামান্তর। আসলে আমাদের সমাজে আমরা সাহিত্য নয় সাহিত্যিকের খ্যাতির প্রতিই বেশি মোহগ্রস্ত বলেই অনেকেই এই ধারণার পৃষ্ঠপোষক। সেই কারণেই দেখা যায়, সহিত্যের হাটে যে সাহিত্যিক যত বেশি জনপ্রিয়, তাকেই আমরা তত বড়ো সাহিত্যিক হিসাবে ধরে নিই। পাশাপাশি কম জনপ্রিয় বা প্রায় অখ্যাত সাহিত্যিকের শ্রেষ্ঠ কীর্তিকেও আমরা আমল দিই না। এসবই হয় জনমানসের মানসিকতার প্রতিফলনে। যে মানসিকতা সাহিত্যবোধের বিপ্রতীপে সমাজিক ন্যায়বোধের উপর প্রতিষ্ঠিত। আবার এই সামাজিক ন্যায়বোধ যে যুগে যুগে সদাই পরিবর্তনশীল একটি ধারণা, অধিকাংশ সময়েই স্মরণে রাখি না আমরা সেই সত্যটিই।

শিকড়ের সন্ধানে


শিকড়ের সন্ধানে
শ্রীশুভ্র

এক

আমরা প্রায়শই দুঃখ করি, আধুনিকতার স্রোতে গা ভাসিয়ে আমরা আমাদের শিকড় থেকে ক্রমশই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি দিনে দিনে। বিশেষত আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যারা আজ বেড়ে উঠছে ঘরে বাইরে, তারা যেন শিকড়হীন এক অস্তিত্বের দিকে এগিয়ে চলেছে দ্রুত গতিতে। একটু চিন্তা করলেই দেখা যায়, এই একই ক্ষোভ ছিল আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মেরও। আমাদের সম্বন্ধে। আমাদের বেড়ে ওঠার কালে। অর্থাৎ বিষয়টি আজকের সমস্যা নয়। প্রতি কালেই এই একই কথা শোনা যায় নবীন প্রজন্মের সম্বন্ধে। অর্থাৎ এইটুকু নিশ্চিত যে, বিষয়টি প্রতি যুগেরই এক বাস্তব সমস্যা। সাধারণত দেখা যায়, আমাদের বয়স বাড়ার সাথে, যতই আমারা বার্দ্ধক্যের দিকে ঢলে পড়তে থাকি, ততই যেন এই ক্ষোভ বড় বেশি সঞ্চারিত হতে থাকে আমাদের মানসিক পরিসরে। সংসার জীবনের পড়ন্ত বেলায় আমরা যেন ধীরে ধীরে আমাদের শিকড় সম্বন্ধে একটু একটু করে হলেও সচেতন হয়ে উঠতে থাকি। যে সচেতনতা আমাদের যৌবনে বিশেষ দেখা যায় না। যায় না বলেই আমাদের সম্বন্ধে আমাদেরই পূর্ববর্তী প্রজন্মেরও একটি ক্ষোভ জায়মান হয়ে উঠতো আমাদের নবীন বয়সের কালে। কিন্তু জীবনের পড়ন্ত বেলায় আমাদের মননের দিগন্তে সেই শিকড়ের প্রতি একটি ভালোলাগার বোধ গড়ে উঠতে থাকে ধীরে ধীরে। এ যেন অনেকটা বয়সের সাথে হারানোদিনের স্মৃতির প্রতি নস্টালজিক অনুভুতি। ফেলে আসা সেইসব দিনের নানান রকমের রীতিনীতি লোকাচার ধর্মকর্ম সংস্কৃতির প্রতি আমাদের মনন প্রক্রিয়ায় নতুন করে যেন একটা ভালোবাসা ভালোলাগা ফিরে ফিরে আসতে থাকে। আর তখনই আমারা অনুভব করি আমাদের নিজেদের শিকড়ের প্রতি একান্ত একটি টান। সেই সময়ে আমাদেরই পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে ঠিক যে টানটার অভাব দেখে আমরা কখনো কখনো ক্ষুব্ধও হয়ে উঠে থাকি।